ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় ২০ বছর পর পুনরায় সরকার গঠনের পথে এগোচ্ছে। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রায় সবাই নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি আগেই নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন সরকার গঠনের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এখন রাষ্ট্রপতির পদে কে বসবেন এবং মন্ত্রিসভার খসড়া কেমন হবে। দলীয় সূত্র জানাচ্ছে, অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠন করার পরিকল্পনা চলছে। একই সঙ্গে বিএনপির বাইরে কয়েকজন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিকেও রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় রাখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা। জামায়াত নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী শিশির মনির এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
গত শনিবার রাতে শিশির মনির নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করব, ইনশাআল্লাহ।’ এরপর রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভা স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, সরকারের কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে।’
জানা যায়, ছায়া মন্ত্রিসভা হলো ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় ব্যবস্থার একটি পরিচিত কাঠামো, যা প্রধানত বিরোধী দল দ্বারা সরকার পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনার জন্য গড়ে তোলা হয়। সাধারণত সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন ছায়া মন্ত্রী মনোনীত হন। তাদের কাজ হলো সরকারের নীতি ও বাজেট বিশ্লেষণ করা, সমালোচনা করা এবং প্রয়োজনে বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা।
যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রক্রিয়া নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সংসদে প্রশ্ন তোলা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের প্রশাসনিক কাঠামো, নীতি প্রণয়ন ও বাজেট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সহায়ক। একই সঙ্গে এটি জনগণের কাছে বিরোধী দলকে কার্যকর ও প্রস্তুত দলের ইমেজ দেখানোর একটি হাতিয়ার।
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির নেই। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন দলগুলোর নীতি ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে আইনী বাধ্যবাধকতা না থাকার কারণে ছায়া মন্ত্রীসভার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃটেনে এটা কাজ করে, কারণ সেখানে শক্তিশালী সংসদীয় চর্চা আছে, নিয়মিত প্রশ্নোত্তর আছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে। ছায়া মন্ত্রিসভা শুধু নাম দিয়ে হয় না। প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিয়ে রিসার্চ, পলিসি ডকুমেন্ট, বিকল্প বাজেট, ধারাবাহিক সংসদীয় লড়াই এসব না থাকলে এটা কাগুজে ঘোষণা হয়েই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।


