
‘নিপুণ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকার ১৯৮৩ সালের মার্চ সংখ্যায় খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল একটি প্রচ্ছদ কাহিনি। প্রচ্ছদের পুরোটা জুড়ে ছিল তাঁর একটি রঙিন ছবি। পত্রিকার ভেতরের পাতায় ‘খালেদা জিয়ার দিনকাল’ শিরোনামে ছাপা হয় একটি আলাপচারিতা, যা লিখেছিলেন অসীম সাহা। এই সাক্ষাৎপর্বে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। তাঁর তোলা বেশ কয়েকটি আলোকচিত্রও ওই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
এই আলাপচারিতাকে প্রচলিত অর্থে প্রথাগত সাক্ষাৎকার বলা যায় না। প্রায় দুই ঘণ্টার কথোপকথনের ফাঁকে ফাঁকে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনযাপন, রুচি-অভিরুচি ও শখের নানা দিক তুলে ধরেছেন লেখক।
মহিউদ্দিন আহমদের লেখা ‘খালেদা’ বই থেকে সেই আলাপচারিতার অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো—
খালেদা জিয়ার দিনকাল
খালেদা জিয়া সময় দিয়েছিলেন দুপুর ১২টায়। মাসিক নিপুণ-এর ব্যাপারে কোনো আলাপ না করেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ আবু সাঈদ খান। তাঁকে নিয়ে আমরা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাসভবনে গিয়েছিলাম জানুয়ারির ১৭ তারিখে। ১৪ বছর ঢাকায় আছি। কোনোদিন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যাইনি। এ এলাকাটা বেশ ঝকঝকে, খুব সাজানো-গোছানো। দেখলেই বোঝা যায়, এ এলাকার সঙ্গে শহরের আর দশটি এলাকার পার্থক্য আছে।
পৌঁছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। গেটে দুজন কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছিল। আমাদেরকে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে বেগম জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে পাঠানোর নির্দেশ এলো।
দেয়ালঘেরা সুদৃশ্য একটি বাড়ি। পরিপাটি ফুলের বাগান। অনেক প্রজাতির গাছপালা বাড়িটাকে নিবিড় করে রেখেছে। খুব নিঝুম মনে হলো। আবু সাঈদ খান জানালেন, রাষ্ট্রপতি জিয়া বেঁচে থাকতে এই বাড়িটিতে মানুষের স্রোত বয়ে যেত। দিনরাত্রি পার্টির লোকজন, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিদেশি কূটনীতিকসহ অনেক লোকই আসত-যেত। এখন একেবারেই ঠান্ডা।
উত্তরদিকে একটি লোহার গেট আছে। সেখানে জিয়ার একটা ভাস্কর্য। খালকাটা বিপ্লবের সময় জিয়া যখন সারা বাংলাদেশ চষে বেড়াতেন, তখন মাঝেমধ্যে কোথাও কোথাও বসে বিশ্রাম নিতেন। গেঞ্জি গায়ে, চোখে সানগ্লাস পরিহিত জিয়ার এই ভাস্কর্যটি শামীম সিকদারের বানানো। পরে শুনেছিলাম খালেদা জিয়ার মুখেই। কলিংবেল টিপতেই এক তরুণ এসে গেট খুলে দিল। আমাদের নিয়ে বসাল পূর্বদিকের একটি সোফাসজ্জিত সুদৃশ্য ঘরে। এখানে বসে জিয়া তাঁর একান্ত লোকজনের সঙ্গে কথা বলতেন, এটাও আবু সাঈদ খানের মুখে শোনা।
আমি আমার পরিচয় দিলাম। মামুন তার (পরিচয় দিলেন)। আবু সাঈদ খান দু-একটি প্রশ্ন করার পর আমি আমার আসার কারণ ব্যাখ্যা করতেই খালেদা জিয়া সবিনয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়ার ব্যাপারে নিজের অক্ষমতার কথা জানালেন। আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এটা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সাক্ষাৎকার। কোনো রাজনৈতিক প্রশ্ন তাঁকে করা হবে না। বস্তুত আমাদের উদ্দেশ্যও অনেকটা তাই ছিল। অবশ্য রাজনৈতিক প্রশ্ন করার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না, এমন বললে মিথ্যে বলা হবে। তবে আমরা প্রধানত তাঁর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবনযাপন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করার পক্ষপাতী ছিলাম বেশি। তাঁকে সে কথাটাই বারবার বুঝিয়ে বললাম। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে রাজি হলেন না।
-দেখুন, এ পর্যন্ত অনেক পত্রিকা থেকেই লোক এসেছে আমার কাছে। আমি কাউকে সাক্ষাৎকার দিইনি। এখন আপনাদের দিলে সেটা খুব খারাপ হবে।
-সেটা ঠিক। তবে পত্রিকার চরিত্রও বিচার করতে হবে। পত্রিকার চরিত্র বুঝে যদি আপনি সাক্ষাৎকার দেন, তাহলে বোধহয় আপনাকে কোনো ঝামেলায় পড়তে হবে না।
-কিন্তু আমি কী করে বুঝব বলুন, কোন পত্রিকা কী চরিত্রের হবে। দৈনিক পত্রিকাগুলোকে আমি চিনি। কয়েকটি সাপ্তাহিককেও চিনি, তাদের চরিত্রও জানি। কিন্তু সব পত্রিকার চরিত্র তো আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। ফলে আমি সিদ্ধান্ত কেমন করে নিই? তা ছাড়া কোনো কোনো দৈনিক ও সাপ্তাহিকও আমার কাছে এসেছে। আমি তাদেরও কিছু বলিনি।
-আমরা আপনাকে বেশি প্রশ্ন করব না। মাত্র দু-একটা প্রশ্ন করব।
-না না, আমি এখন সাক্ষাৎকার দেব না।
আবু সাঈদ খান এতক্ষণ বেশ চুপচাপ ছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন।
-দেখুন ভাবি, আপনাকে আজ হোক কাল হোক, মুখ তো খুলতেই হবে। প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে।
-তা হয়তো হবে। যখন হবে তখন দেখা যাবে। কিন্তু এখন নয়।
আমি বললাম,
-আপনি সাক্ষাৎকার না দিলে আমরা কিন্তু আমাদের প্রচ্ছদ-কাহিনি করতে পারব না। আপনিই হবেন এবার আমাদের প্রচ্ছদ চরিত্র। এখন আপনি রাজি না হলে আমাদের প্রকাশনার তারিখ পিছিয়ে দিতে হবে।
-না না, তা কেন। আপনারা অন্য কাউকে দিয়ে প্রচ্ছদ-কাহিনি করুন। বাংলাদেশে আরও অনেক লোকই তো আছে।
-তা আছে। কিন্তু আমরা তো আপনার কথা ভেবে এসেছি। আপনি সম্ভবত আমাদের অবিশ্বাস করছেন, আমরা আপনার সম্পর্কে যাচ্ছেতাই লিখে দিই কি না।
-না না, আমি আপনাদের মোটেই অবিশ্বাস করছি না। কিন্তু আমি এখন কাউকেই কোনো সাক্ষাৎকার দিতে চাই না। দেখুন, অনেক দিন আমি কোনো সভাসমিতি, সেমিনারেও যাই না।
আবু সাঈদ খান বললেন,
-পত্রিকায় দেখলাম, 'জিয়া স্মৃতি সংসদ' করেছেন। সেটার খবর কী?
-হ্যাঁ, সংসদ হলো। তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই এটা করা হয়েছে। তাঁর কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এখন সবার।
-তা তো বটেই। তবে আমার কী মনে হয় জানেন? এজন্য 'জিয়া স্মৃতি সংসদের' একটা সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট দরকার।
খালেদা জিয়া সঙ্গে সঙ্গে আবু সাঈদ খানের কথায় সায় দিলেন। ইতোমধ্যে যে ছেলেটি আমাদের গেট খুলে দিয়েছিল, চা নিয়ে এলো। চা খেতে খেতে খালেদা জিয়ার মুখে মৃদু হাসির সঙ্গে সব সময় একটা বিপদের ছায়া গাঢ়তর হয়ে উঠতে দেখলাম আমি। চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম,
-আপনি বোধহয় বাইরে তেমন যান-টান না। সময় কাটান কী করে?
-এই আপনাদের মতো মাঝেমধ্যে কেউ কেউ এলে তাদের সঙ্গে কথা বলে কিংবা মাঝেমধ্যে দু-একজন আত্মীয়স্বজনের বাসায় গিয়ে। তবে সেটা খুবই কম। আগেও আমি বাইরে তেমন একটা বের হতাম না। এখনও না। কেটে যায় এভাবেই।
নাসির আলী মামুন প্রশ্ন করল,
-বই পড়েন না?
-হ্যাঁ পড়ি।
-কী ধরনের বই?
-সব ধরনের বই-ই। যখন যেটা ভালো লাগে।
সব কথাই হচ্ছিল আলাপের ফাঁকে ফাঁকে। কথার ফাঁকে ফাঁকেই আমরা দু-একটা প্রশ্ন করে দু-একটা উত্তরও জেনে নিচ্ছিলাম। আমার বিশ্বাস, আমরা আগে 'অ্যাপয়েন্টমেন্ট' করে সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে তিনি সরাসরি নাকচ করে দিতেন। এখন আমাদের সঙ্গে আলাপ না করলে সেটা অভদ্রতা হয় বলেই তিনি আমাদের সঙ্গে আলাপ করে যাচ্ছিলেন। আর আমাদের যেটা প্রয়োজন ছিল, সেটা হলো তাঁর সঙ্গে আলাপের সময়টুকু লেখায় ও ছবিতে ধরে রাখা। মামুনের সঙ্গে ক্যামেরা ছিল। আমি বেগম খালেদা জিয়াকে বললাম,
-সাক্ষাৎকার দেবেন না, ছবি কিন্তু দিতে হবে।
এ ব্যাপারে খালেদা জিয়া আপত্তি করলেন না। মৃদু হেসে বললেন,
-তা দিতে পারি।
মামুন ক্যামেরা হাতে উঠে দাঁড়াল। খালেদা জিয়া একটু নড়েচড়ে বসলেন। চোখ মেলে উদাস তাকিয়ে রইলেন। মামুন পরপর দুটো ছবি তুললে আমি বললাম,
-এবার একটা অনুরোধ, আপনার দুই ছেলের সঙ্গে আপনার একটা ছবি তুলতে চাই। ওরা কি বাসায়?
-ছোটজন স্কুলে। বড়জন বাসায়, পড়ছে। সামনে পরীক্ষা তো।
কাকে যেন বললেন ছেলেকে ডেকে দিতে।
কিছুক্ষণ পর খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক এসে ঢুকল। নিজেই পরিচয় দিল,
-আমার নাম তারেক রহমান।
খুব স্মার্ট, সপ্রতিভ মনে হলো। বললাম,
-তোমার একটা ছবি তুলব। তোমার ছোট ভাই তো স্কুলে।
সঙ্গে সঙ্গে তারেক বলল,
-ও এসেছে।
-তাহলে ওকে একটু ডাকবে?
খালেদা জিয়া বললেন,
-ও ভীষণ লাজুক আর দুষ্টু। ও কিছুতেই আসবে না।
বেগম জিয়া হাসলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারেক বলল,
-দেখি, আমি ওকে আনতে পারি কি না।
বলে ও দৌড়ে চলে গেল। ফিরে এসে বলল,
-ও আসছে।
কিছুক্ষণ পর বেগম জিয়ার ছোট ছেলে এসে ঢুকল। জিজ্ঞেস করলাম,
-কী নাম তোমার?
-আরাফাত রহমান।
-তুমি নাকি লাজুক আর দুষ্টু? সত্যি নাকি?
আরাফাত মাথা নিচু করে ঢুকেছিল। মাথা নিচু করেই রইল।
তারেক আর আরাফাতসহ খালেদা জিয়ার দুটো ছবি তুলল মামুন। ক্যামেরা ক্লিক করার আগে মামুন এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করল,
-আপনার (খালেদা জিয়া) হবি কী?
-আগে আমার হবি ছিল ফুলের বাগান করা। ফুল সংগ্রহ করা এখনো আমার হবি। যতবার বিদেশে গিয়েছি, অনেকে আমাকে অনেক কিছু উপহার দিয়েছে। আমি সবকিছু ছেড়ে শুধু ফুলটাই সংগ্রহে রেখেছি। ফুল আমার খুব ভালো লাগে। ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে এক মুহূর্ত দেরি না করে আরাফাত ছুটে চলে গেল। এ সময় টেলিফোন বেজে উঠলে খালেদা জিয়া কার সঙ্গে যেন কথা বললেন।
এই ফাঁকে আবু সাঈদ খান আমাদের জানালেন, এই ঘরে রাষ্ট্রপতি জিয়া এক সময় অনেকের সঙ্গে অনেক বিষয়ে একান্তে কথা বলেছেন। পাশের রুমটি ছিল বলতে গেলে কনফারেন্স রুম। সুদৃশ্য পর্দা দিয়ে ঢাকা।
খালেদা জিয়া টেলিফোনে কথা শেষ করে এসে পাশের একটা সোফায় বসলেন। তাঁর পাশে তারেক। তারেক মামুনকে পেয়ে নিজের ক্যামেরার কী একটা দোষের কথা বলল। মামুন ওটা ঠিক করে দেওয়ার কথা বললে তারেক খুব খুশি হলো। ছবি তোলার ব্যাপারে তারেকের খুব উৎসাহ। এখন পরীক্ষা, তাই তুলতে পারছে না। বই পড়ার ব্যাপারে তার দারুণ আগ্রহ। সায়েন্স ফিকশন খুব পছন্দ করে সে। গানও তার পছন্দ। তবে ঢিমে তালের নয়, একটু দ্রুত লয়ের গান।
মামুন খালেদা জিয়ার আরও কয়েকটি ছবি তোলার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তিনি উঠে একটু ভেতরে গেলেন। এই ফাঁকে আমি তারেককে বললাম,
-দেখ তারেক, তোমাকে একটু সাহায্য করতে হবে, তোমার আম্মার একটা সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যাপারে। তোমার আম্মা কিছুতেই কোনো কথা বলতে রাজি নন। অথচ তোমার আম্মাকে নিয়েই এবার আমরা প্রচ্ছদ-কাহিনি করছি।
তারেক বলল,
-কেন, আম্মা কী বলেছে?
-তিনি নাকি কাউকেই সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন না। অথচ আমরা কয়েকটি সাধারণ বিষয় জানলেই খুশি হতাম।
-আপনারা কী জানতে চান?
-তোমাদের বাড়ি কোথায়?
-কেন, বগুড়া।
তোমার নানা বাড়ি?
-নোয়াখালী।
-সেখানে কখনও গিয়েছ?
তারেক মাথা নাড়ল। যায়নি সে।
কথা বলতে বলতে ফিরে এলেন খালেদা জিয়া। তখন প্রায় দুটো বাজে। আমি ভাবলাম, এবার ওঠা যাক। উঠবার আগে খালেদা জিয়াকে বললাম,
-কোনো প্রশ্নের জবাবই তো দিলেন না। যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করি। আপনার জন্মস্থান কোথায়?
-(হেসে) দিনাজপুর।
-কী আশ্চর্য! আমরা তো জানতাম নোয়াখালী! আপনি তো সবসময় ঢাকাতেই, তাই না?
-হ্যাঁ-না, অনেক দিন ধরেই ঢাকায়। তবে কিছুদিন দিনাজপুরেও ছিলাম। আমার আব্বা দিনাজপুরে ব্যবসা করতেন।
-অনেক বিরক্ত করলাম। তবে একটা অনুরোধ রইল, সাক্ষাৎকার দিলে আমরাই যেন আগে পাই।
-(হেসে) দেওয়ার মতো কিছু থাকলে সবাইকে ডেকে একদিন সব বলে দেব।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ অ্যাডভোকেট মোঃ শরীফ মিয়া
অফিস ঠিকানা: বাড়ি নং ১৫ (৬ষ্ঠ তলা), রোড নং ১৯, সেক্টর নং ১১, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
somriddhabangladesh@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ. All rights reserved.