মানুষের জীবন নিরবচ্ছিন্ন কোনো সুখের পথ নয়; বরং তা নিরন্তর এক সংগ্রামের নাম। জীবনের বাঁকে বাঁকে কখনো দেখা দেয় তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, কখনো শরীর ভেঙে দেয় দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা। আবার কখনো পারিবারিক অশান্তি কিংবা নিভৃত মানসিক অবসাদ মানুষকে করে তোলে দিশেহারা। ইসলামি জীবনদর্শনের আলোকে, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের প্রধান অবলম্বন হওয়া উচিত স্রষ্টার ওপর অটুট বিশ্বাস। পরম করুণাময়ের কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই এই সংকট উত্তরণের শক্তি ও মানসিক শান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের রব বলেছেন-তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)
দোয়া শুধু একটি আমল নয়, এটি একজন মুমিনের আত্মিক জীবনরেখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার মাধ্যমেই জীবনের প্রতিটি কাজ শুরু করতেন এবং দোয়ার মাধ্যমেই সমাপ্ত করতেন। সকাল-সন্ধ্যার জীবনঘনিষ্ঠ দোয়াগুলো যদি সবাই গুরুত্ব দিয়ে আমল করে, তাহলে দৈনন্দিন জীবন হবে পরিশুদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত।
উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এই দোয়া তিনবার পড়বে, সকাল পর্যন্ত তার ওপর কোনো আকস্মিক বিপদ আপতিত হবে না। দোয়াটি হলো—বিসমিল্লাহিল্লাজি লা-ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামায়ি ওয়া-হুয়াস সামিউল আলিম।’
অর্থ : আমি শুরু করছি সেই আল্লাহর নাম নিয়ে, যাঁর নাম নিলে জমিন ও আসমানের কিছু কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।
যে ব্যক্তি সকালে এই দোয়া তিনবার পাঠ করবে, সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো আকস্মিক বিপদ আপতিত হবে না। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৮৮; আবু দাউদ, হাদিস : ৫০০০)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো প্রতিটি দোয়া রহমে পরিপূর্ণ, অপ্রতিরোধ্য ও নির্ভুল। এটি নিয়মিত পাঠ করা হলে জাদু, জিন, সাপ, বিচ্ছু বা যেকোনো প্রাকৃতিক বা অতিপ্রাকৃত অনিষ্ট থেকে আল্লাহ তাআলা হেফাজত করেন।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! গত রাতে একটি বিচ্ছু আমাকে দংশন করলে আমি বড় কষ্ট পাচ্ছি।
তখন রাসুল (সা.) বলেন, যদি তুমি সন্ধ্যায় এই দোয়াটি পাঠ করতে-আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তা-ম্মাতি মিন শাররি মা খালাক, তাহলে সে তোমাকে কষ্ট দিতে পারত না। (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৩২; তিরমিজি, হাদিস : ৩৬০৪)
৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হেফাজতের দোয়া
আব্দুর রহমান ইবনে আবু বাকরা (রহ.) একদা তাঁর পিতাকে জিজ্ঞাসা করেন, হে আমার পিতা! আমি আপনাকে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় এই দোয়াটি তিনবার পাঠ করতে শুনি-আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাদানি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি সামই, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাসারি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, এর কারণ কী?
উত্তরে তাঁর পিতা বলেন, এই দোয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এর অর্থ হলো : হে আল্লাহ! আমার দেহকে রোগমুক্ত রাখুন, আমার কান ও চোখকে রোগমুক্ত রাখুন, আপনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।
তিনি আরও বলেন- আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই দোয়া পাঠ করতে শুনেছি। আমি তাঁর সুন্নতের ওপর আমল করতে পছন্দ করি। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০০২)
৪. দুশ্চিন্তা দূর করার দোয়া
(অর্থ : আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি তাঁর ওপর ভরসা করি এবং তিনি মহান আরশের রব), আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবেন যা তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তার বিরুদ্ধে-চাই সে সত্যিকারভাবে অথবা কৃত্রিমভাবে বলুক না কেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯৫)
৫. ঋণ পরিশোধের দোয়া
জীবনে দুশ্চিন্তা আর ঋণের ভার মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করে যে তার হৃদয়ে একটুও স্বস্তি থাকে না। হতাশা, অস্থিরতা আর ভেতরের অজানা এক ভয় জীবনের সব রং মুছে দেয়। এ অবস্থায় আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী। তাই তাঁর কাছে দোয়া করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঋণ পরিশোধের জন্য সকাল ও সন্ধ্যায় এই দোয়া পাঠ করতে বলেছেন। দোয়াটি হলো- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজুবিকা মিন গালাবাতিদ-দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল।’
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি তোমার নিকট দুর্বলতা ও অলসতা হতে আশ্রয় কামনা করছি, তোমার নিকট কাপুরুষতা ও কৃপণতা হতে নাজাত কামনা করছি এবং আমি তোমার নিকট ঋণভার ও মানুষের দুষ্ট প্রভাব হতে পরিত্রাণ চাচ্ছি। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৫৫)
৬. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের দোয়া
আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা এভাবে সন্তুষ্টির কথা বলবে, তিনিও তাকে কিয়ামতের দিন সন্তুষ্ট করবেন। সাওবান (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেউ যদি সন্ধ্যায় এই দোয়াটি পাঠ করে তাহলে সেই ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করা আল্লাহর ওপর হক হয়ে যায়।
দোয়াটি হলো- ‘রাদিতু বিল্লাহি রাব্বান, ওয়াবিল ইসলামি দ্বিনান, ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিয়্যান।’
অর্থ : আমি রব হিসেবে আল্লাহর প্রতি, দ্বিন হিসেবে ইসলামের প্রতি আর নবী হিসেবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সন্তুষ্ট। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৮৯)


