বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন রোববার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে। কমিশনের দাবি—২০০৯ সালে তৎকালীন বিডিআর সদর দফতরে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল, তার সঙ্গে দলগতভাবে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, এবং পুরো ঘটনার সমন্বয়কারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন সাবেক ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্যান্য সদস্যরা এই প্রতিবেদন জমা দেন।
কমিশনের সদস্যরা ছিলেন—মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক (অব.), যুগ্মসচিব (অব.) মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, ডিআইজি (অব.) ড. এম. আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন অন্ধকার ও প্রশ্নের অবসান ঘটানোর মতো গুরুত্ব বহন করছে এই প্রতিবেদন। তিনি কমিশনের ভূমিকার প্রতি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, প্রতিবেদনে এমন অনেক শিক্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, যা জাতির জন্য ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হয়েছে। ১৬ বছরের পুরোনো এই ঘটনার বহু আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই বিদেশে চলে যাওয়ায় তদন্ত ছিল চ্যালেঞ্জিং।
তার ভাষায়—সাক্ষ্য, আগের তদন্ত রিপোর্ট, মাঠপর্যায়ের তথ্য—সবকিছু সমন্বিত করে আমরা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। কেন সেনাবাহিনী সেদিন অ্যাকশন নেয়নি—এমন জটিল প্রশ্নেরও জবাব খুঁজে দেখা হয়েছে।
তিনি জানান, তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তি এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘সরাসরি সম্পৃক্ততা’র প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, ঘটনার আড়ালে থাকা বাহ্যিক ও অন্তর্নিহিত কারণ দুটোই কমিশন চিহ্নিত করেছে। তার দাবি—ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত, এবং প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তৎকালীন সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস।
তিনি যোগ করেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ঘটনাকে আড়াল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমে ২০–২৫ জনের মিছিল পিলখানায় প্রবেশ করলেও বের হওয়ার সময় সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই শতাধিক।
কমিশন প্রধান আরও দাবি করেন—এই ঘটনার পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার “গ্রিন সিগন্যাল” ছিল। দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি বলেন—সেদিনকার সরকার প্রধান থেকে সেনাপ্রধান পর্যন্ত সবারই দায় রয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক সমাধানের পথে নেওয়াই ছিল তখনকার সিদ্ধান্ত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতিও ছিল প্রকট।
তিনি উল্লেখ করেন—কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যেসব বিডিআর সদস্য যমুনায় বৈঠক করেছিলেন, তাদের সঠিক তথ্যও সংরক্ষিত হয়নি।
প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ এবং স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি।


