দলমত–নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্রোতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অবিসংবাদিত নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের আপসহীন প্রহরী এই মহীয়সী নারীর বিদায়ে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো দেশ—কোটি মানুষের চোখে নেমে আসে নীরব জলধারা।
জীবদ্দশায় দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, “এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বিদেশে আমার আর কোনো ঠিকানা নেই।” সেই অঙ্গীকারেরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল তাঁর শেষ যাত্রায়। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, নিজ দেশের মাটিতে, প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি। জ্যেষ্ঠপুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ হাতে কবরে নামালেন মমতাময়ী মায়ের মরদেহ। কবরস্থ শেষে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, তিন বাহিনীর প্রধানসহ বিশিষ্টজনেরা পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে শেষ শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার—গণতন্ত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা এই নেত্রীর প্রতি এক অনন্য সম্মান।
গতকাল দুপুরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন রূপ নেয় মানুষের মহাসমুদ্রে। ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি সড়ক এসে মিশে যায় এক বিন্দুতে—শেষ বিদায়ের কাতারে। বেলা ঠিক ৩টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক চার তাকবিরে জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন। জানাজা শেষে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। বিকাল পৌনে পাঁচটার দিকে শেরেবাংলা নগরে শহীদ জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এই জানাজায় কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না—ছিল শুধু কলেমার ধ্বনি, নীরব শ্রদ্ধা আর অশ্রুর ভাষা। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারেক রহমান ইসলামী রীতি অনুযায়ী মায়ের সব দায়ভার গ্রহণ করেন এবং জ্ঞাত–অজ্ঞাত কোনো কষ্ট হয়ে থাকলে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে মায়ের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া চান।
এই শোকাবহ দিনে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে, পালন করা হয়েছে সাধারণ ছুটি। জানাজা ও দাফন ঘিরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল, জাতীয় সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকা ছিল অভেদ্য নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ঘেরা। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করে।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় উপস্থিত হন ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর প্রয়াণ রেখে গেছে গভীর ছাপ।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে হাসপাতালই হয়ে উঠেছিল তাঁর নীরব আশ্রয়। দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে মঙ্গলবার ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। জীবনের সব হিসাব চুকিয়ে পরপারে পাড়ি জমান বাংলাদেশের রাজনীতির এক আপসহীন, দৃঢ়চেতা ও ইতিহাসগড়া নেত্রী।