
পুলিশের লুট হওয়া বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লুটের এক বছর পর গত ১০ আগস্ট অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। বরং আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে কি না—তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিপুল সংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে মারাত্মক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে সহিংসতা, রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শন এবং গুরুতর অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা বাড়ছে।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর অবৈধ অস্ত্রের মজুত নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় ২২ ডিসেম্বর খুলনার সোনাডাঙায় একটি বাড়িতে দলীয় অন্তঃকোন্দলের জেরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) খুলনা বিভাগীয় প্রধান ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হন।
এ ছাড়া যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, পাবনাসহ দেশের অন্তত ২০টি জেলায় গত ১৪ মাসে প্রতিপক্ষের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে পাঁচ শতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যাহত করতে অপরাধী চক্র অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে বিদ্যমান অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র যুক্ত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে গত ১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেন।
ঘোষণা অনুযায়ী, একটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধার করলে সন্ধানদাতাকে দেওয়া হবে ৫ লাখ টাকা। সাব-মেশিনগানের (এসএমজি) জন্য দেড় লাখ টাকা, চায়না রাইফেলের জন্য ১ লাখ টাকা এবং পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ওই সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭৫টি এবং গুলি ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৪৯ রাউন্ড।
তবে পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৯০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো ১ হাজার ৩৪০টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৯ রাউন্ডের বেশি গুলির কোনো সন্ধান নেই। নিখোঁজ অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), হালকা মেশিনগান (এলএমজি), বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান ও টিয়ারগ্যাস লঞ্চার।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া বা খোয়া যাওয়া অস্ত্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাতে চলে গেছে। অস্ত্রের ক্রেতা ও বাহকদের শনাক্ত করতে সময় লাগবে। অনেক অস্ত্র হাতবদল হয়ে অপরাধী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি হয়েছে। আবার কিছু অস্ত্র ও গুলি ভয়ের কারণে নদী বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় সরকার নির্বাচনের আগে নতুন আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান স্থগিত রেখেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকা জেলা প্রশাসন প্রায় ৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান করেছে।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১৭ হাজার ২০০টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এসব লাইসেন্স স্থগিত করে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪০টি অস্ত্র জমা পড়লেও ৩ হাজার ৮৬০টি এখনো জমা দেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেসব অস্ত্র ও লাইসেন্স আত্মসমর্পণ করা হয়নি, সেগুলো এখন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হিসেবে গণ্য হবে।
লাইসেন্স বাতিলের অংশ হিসেবে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১ হাজার ১৭৭টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নামে ইস্যু করা ছিল। ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭৯৬টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া পাবনায় ১৪১টি, চট্টগ্রামে ৭৩টি, যশোরে ৬৬টি, সিলেটে ৬৩টি এবং কক্সবাজারে ৩৮টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অনেক লাইসেন্সধারী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। আবার অনেকে দাবি করেছেন, বিদ্রোহের সময় তাদের অস্ত্র চুরি হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা—মাহবুবুল আলম হানিফ, নিজাম উদ্দিন হাজারী, শামীম ওসমান ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ অ্যাডভোকেট মোঃ শরীফ মিয়া
অফিস ঠিকানা: বাড়ি নং ১৫ (৬ষ্ঠ তলা), রোড নং ১৯, সেক্টর নং ১১, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
somriddhabangladesh@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ. All rights reserved.